আজ শনিবার, ১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

দৃষ্টিসীমায় দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে পদ্মা সেতু, স্বপ্ন ছোয়ার অপেক্ষা

এক সময়ের স্বপ্নের সেতু এখন দৃষ্টিসীমায় দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে। পদ্মার তীর থেকে দেখা যাচ্ছে পিলারের দীর্ঘ সারি। তার উপর একে একে বসানো হচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো (স্প্যান)। ২৫তম স্পেন বসানোর মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় চার কিলোমিটার দৃশ্যমান পদ্মাসেতু । বাকি পিলারের উপর বসবে আর ১৬টি স্প্যান। এ কাজ শেষ হবে জুলাইয়ে। এরপর থেকেই শুরু হবে সেতু ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষা। সবকিছু ঠিক থাকলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর ২০২১ সালের জুনে উদ্বোধন হচ্ছে স্বপ্নের সৌধ। উদ্বোধনের পর থেকেই শুরু হবে স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। সময়কে উপেক্ষা করে সেতু দিয়ে ছুটবে বাস, ট্রাক, ট্রেন সব।

সেতুটি চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এতে মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ১ থেকে দেড় শতাংশ বাড়বে। দারিদ্র্যের হার কমবে দশমিক ৮৪ শতাংশ। নতুন করে গড়ে উঠবে ভারি শিল্প কারখানা। আর এরই অপেক্ষায় যেন বাংলাদেশ।

পদ্মা সেতু শুধু রড, সিমেন্ট ও পাথরের সেতু নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৬ কোটি মানুষের আবেগ। চ্যালেঞ্জকে জয় করার অদম্য স্পৃহা এবং আগামীতে দেশের অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনার হাতছানি। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করার পর সরে যায় আর্ন্তজাতিক আরও তিনটি সংস্থা- এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।

এতে পদ্মার আকাশে দেখা দেয় কালো মেঘের ঘনঘটা। ওই সময়ে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। যা ওই বছরের মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৫০ শতাংশ। ফলে নাগালের বাইরে চলে যায় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের স্বপ্ন। পরের ইতিহাস সবার জানা। সব বাধা উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার।

এতেই কেটে যায় কালো মেঘ, দিগন্ত আলোকিত করে হেসে উঠে সূর্য। সেতু নির্মাণের কর্মযজ্ঞের মধ্যদিয়ে শুরু হয় স্বপ্নের বীজ বোনা। আর সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে ধরা দিচ্ছে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ সেতু বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতিতে সরাসরি এর সুফল আসবে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি তিন ধরনের সুবিধা রয়েছে।

প্রথমত, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। এতে ওই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার লাভ করবে। বিনিয়োগ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সরাসরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত, এ সেতুর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার হবে। বিশেষ করে ভারতের বাণিজ্য বাড়াতে মোংলা বন্দর ব্যবহার করা যাবে।

প্রকল্পের ৪১টি স্প্যানের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৫টি বসানো শেষ হয়েছে। এতে প্রায় চার কিমি. সেতু দৃশ্যমান হয়। এপ্রিলের মধ্যে সেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে বাকি চারটির নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এর তিন মাসের মধ্যেই শেষ হবে অবশিষ্ট স্প্যান বসানোর কাজও।ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল সেতু নির্মাণে অগ্রগতি হয়েছে ৮৬ শতাংশ।

সার্বিকভাবে প্রকল্পের অগ্রগতি ৭৭ ভাগ। এর মধ্যে নদীশাসন কাজ ৬৮ ভাগ, সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া ১০০ ভাগ এবং ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ উন্নয়ন কাজ ৮০ ভাগ। এ সেতু নির্মাণ অগ্রগতির সঙ্গে ভাগ্য ফিরছে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের। এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের জমির দামের বাইরে অতিরিক্ত ৬৬৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা সহায়তা দেয়া হয়েছে। প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৭৯৩টি। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ, শিক্ষার জন্য স্কুল নির্মাণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এটি আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। এ সেতুর মাধ্যমে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাবে। ইতিমধ্যে এসব জেলায় নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠছে। সেগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। সবমিলিয়ে এটি বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।