আজ শুক্রবার, ২১শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

নড়িয়ায় প্রমত্তা পদ্মার বিধ্বংসী রূপ, হাজারো মানুষের হাহাকার

নড়িয়ায় প্রমত্তা পদ্মার বিধ্বংসী রূপ নিয়ে গ্রাস করছে সবকিছু। এর আগে পদ্মার এমন ভয়াবহতা দেখেনি পদ্মা পাড়ের মানুষ। চোখের সামনেই নিজেদের শেষ সম্বলটুকু শেষ হতে দেখে নিজেদের নিয়ন্ত্রন করতে পারছেনা তারা। পদ্মা পাড়ে এখন শুধু ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোর হাহাকার।

গত এক সপ্তাহে পদ্মার অব্যাহত ভাঙ্গণে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ২’শ বছরের পুরনো মূলফৎগঞ্জ বাজারসহ আশেপাশে ৫ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কাঁচা-পাকা বসতঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১ ও ২ ভবন থেকে আসবাব পত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। রোববার দুপুরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের আঙ্গীনায় ফাটল ধরেছে। ভাঙ্গণ ঝুঁকিতে রয়েছে পুরনো এ বাজারের আরো সহস্রাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বীমা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বসতঘর। যে কোন মুহুর্তে বিলীন হয়ে যেতে পারে নড়িয়া উপজলার একমাত্র ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও বাজার সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মূলফতগঞ্জ ফাজিল মাদ্রাসা।

এদিকে ভাঙ্গন রোধে সরকার ৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে পদ্মার পাড়ে জিও ব্যাগ ফেলছে। স্থানীয়দের ধারণা বহুতল বহুতল একটি ভবন নদীগর্ভে মূহুর্তে বিলিন হয়ে যায়। সেখানে বালুভর্তি একটি জিও ব্যাগের কী গুরুত্ব থাকতে পারে। সরকার কোটি কোটি টাকার জিও ব্যাগ নদীতে না ফেলে গরীব অসহায় লোকদের সাহায্য দিয়ে বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করলে ভালো হতো।
আ. রব বেপারী জানায়, ওয়াপদা এলাকায় তার বাড়ি ছিল। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেখানদিয়ে আজ বড়-বড় লঞ্চ-স্টীমার যায়। নড়িয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে ভাড়া বাসায় উঠেছে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে। এ পর্যন্ত একবার সহায়তা পেয়েছেন। ভাঙ্গণ রোধে যে জিও ব্যাগ নদীতে ফেরা হয়েছে তা কোন কাজে আসছে না। ঠেকানো যায়নি ভাঙ্গণ। এ অর্থ দিয়ে গরীব অসহায় ও অনাহারি মানুষের জীবান বাঁচানো হয়।

আল আমিন, সবুজ রানা হওলাদার ও জয়নাল ফকির জানায়, ভাঙ্গণ অব্যাহত রয়েছে। মানুষের জীবন বাচছে না। নদীতে জিও ব্যাগ ফেলে কি হবে? যে খানে একটা বহুতল ভবন ২০ সেকেন্ডে নগী গর্ভে বিলিন হয় সেখানে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ কি করবে।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী এ বছর নড়িয়া উপজেলার পদ্মার পারে বিভিণœ এলাকায় প্রায় ৪ হাজার পরিবারের বাড়ি-ঘর ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গণ কবলিতরা একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ছুটছে। পদ্মার তীরবর্তী এলাকার লোকজনের চোখে কোন ঘুম নেই। তারা দিন রাত তাদের সর্বশেষ সম্বল ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট সরিয়ে নিতে প্রাণপন চেষ্টা করলেও চোখের সামনেই মুহুর্তে বিলীন হচ্ছে সব কিছু। এলাকাবাসীর দাবি, ভাঙ্গণ রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এখনো নড়িয়া বাজার, ঐতিহ্যবাহী মূলফৎগঞ্জ মাদ্রাসা কমপ্লেক্স রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

ভাঙ্গণ কবলিত এলাকাবাসী সুজন ঢালী, ইব্রাহীম ঢালী জানান, এ বছর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই রাক্ষুসী পদ্মা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দক্ষিণে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে এসেছে। গত ৫দিন ধরে ভাঙ্গণ শুর হয়েছে ২’শ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মূলফৎগঞ্জ বাজারের উত্তর পাশ। ইতোমধ্যে এই বাজারে অবস্থিত নুর হোসেন দেওয়ান ও ইমাম হোসেন দেওয়ানদের তিন তলা ৪ টি ভবনসহ ৩ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একেকটি ভবন ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ সময় শত শত লোকজন শুধু আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ভবনগুলো চোখের সামনেই বিলীন হলেও কারো পক্ষেই করার কিছু ছিল না।

ভাঙ্গণে ক্ষতিগ্রস্থ জয়নাল দেওয়ান, জবেদ দেওয়ান, নাছির দেওয়ান জানায়, এলাকার সর্বস্বহারা মানুষগুলো দিন রাত করে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজলেও তেমন কোন সুযোগ সুবিধা পায়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তারা বর্ষার আগেই চেয়েছিল সরকারি কোন সাহায্য নয় পদ্মার দক্ষিণ তীরে নড়িয়া উপজেলা শহর এবং পুরনো এ মূলফৎগঞ্জ বাজারটি রক্ষায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ভয়াবহ ভাঙ্গণ রোধে সরকার পদ্মা নদীর দক্ষিণ (ডান) তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প গ্রহণ করে। এরপর গত ২ জানুয়ারি তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে তা একনেকের বৈঠকে পাস করে। বর্ষার আগে এ সব এলাকার হাজার হাজার মানুষ স্থাীয় বেড়ি বাঁধের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে বাঁধ নির্মাণ কাজ এখনো শুরু করা হয়নি। বর্ষার শুরু থেকে অব্যাহত ভাঙ্গণ শুরু হলে ৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে নদীর গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কাজ ধীর গতিতে হওয়ায় ভাঙ্গন রোধে কোন কাজেই আসেনি সরকারে এ অতিরিক্ত বরাদ্দ। রক্ষা করা যায়নি ঐতিহ্যবাহী এ বাজারসহ মসজিদ, মাদ্রাসা, বিলাশবহুল বহুতল ভবনসহ হাজার হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি। এ এলাকার অনেক বিত্তবান লোকজন সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই।  ইতোমধ্যে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মালামাল সরিয়ে অন্যত্র নেয়া হয়েছে এবং হাসপাতালের রোগীদের পাশের একটি ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শরীয়তপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ভাঙ্গণ আতংকে এসব এলাকা থেকে বিদ্যুতের খুঁটি সরিয়ে নেয়ায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে বাজার, হাসপাতালসহ আশ পাশের এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ।

কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ঈমাম হোসেন দেওয়ান, হাসেম দেওয়ান বলেন, গত ২ মাসে পদ্মার ভাঙ্গণে প্রায় ৪ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। কোন জনপ্রতিনিধি সহ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা কোন রকম সাহায্য সহযোগিতা করেনি। এলাকায় মহা দূযোর্গ চলছে। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমাদের ছেলে মেয়েদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। আমরা এখন ভূমিহীনদের কাতারে চলে এসেছি। এতে আমাদের দুঃখ নেই। এখনো যদি সরকার দ্রুত গতিতে পদ্মার দক্ষিণ তীর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে তাহলে আরো হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘরবাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হবে।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, পদ্মা নদী নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অতি কাছে চলে আসায় হাসপতালের মালামাল জেলা প্রশাসক মহোদয় এবং সিভিল সার্জনের নির্দেশক্রমে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। রোগিদের জন্য হাসপাতাল ভবনের দক্ষিণ পার্শ্বের আবাসিক দু’টি ভবনে ভর্তি কার্যক্রম এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোপূর্বে প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। খুব শিঘ্রই ৩’শ ৫০ জন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে ২ বান্ডিল করে টিন ও নগদ ৬ হাজার করে টাকা বিতরণ করা হবে।