আজ সোমবার, ২৩ মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২১ শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি
Home » টপ »

কফিন বন্দি হয়ে দেশে ফিরলো বাপ্পির স্বপ্ন

বাপ্পির স্বপ্ন ছিল পরিবার নিয়ে ভালো থাকবেন। তাই বাড়ির পাশে এক দালালের প্ররোচনায় অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। লিবিয়া যেতে পারলেও ভাগ্য তাকে আর ইটালি যেতে দেন নি। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ঝড় বাতাস ও বৃষ্টির কারণে ঠান্ডায় প্রাণ হারান কামরুল হাসান বাপ্পী।

রোববার রাতে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায় নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে দাফন করা হয় কামরুল হাসান বাপ্পীর।

বাপ্পি উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের মৃধা কান্দি এলাকার আবুল বাসার কাজীর ছেলে। তারা দুই ভাই এক বোন।

জানা গেছে, গত ২৪ জানুয়ারি ২৮৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। এদের মধ্যে ২৭৩ জন ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। অভিবাসনপ্রত্যাসী অন্যান্যরা মিশরীয় নাগরিক। তিউনিসিয়ার ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে যাওয়ার পরে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর টানা ছয় ঘণ্টা বৃষ্টিপাতের কবলে পড়ে তাদের নৌযান। এ সময় প্রচণ্ড ঠান্ডায় হিম হয়ে মারা যায় ৭ বাংলাদেশি। গত ২৫ জানুয়ারি বিষয়টি জানতে পারে বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাস থেকে জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করে।

নিহতের বাবা আবুল বাসার কাজী বলেন, গত নভেম্বর দালাল নাসির উদ্দিন বেপারী আমার ছেলেকে ভুল বুজিয়ে ইটালীর যাওয়ার প্ররোচনা দেয়। আমরা ছেলে প্রথমে যেতে না চাইলেও পরে যাওয়া সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৫ জানুয়ারি লিভিয়া থেকে ইটালী যাওয়ার জন্য আমার থেকে স্থানীয় দালাল তিন লক্ষ টাকা নেন। আমি ছেলেকে বলে ছিলাম এই ঠান্ডায় যাতে করে সাগরে পাড়ি না দেয়। কারণ ঠান্ডায় মানুষ অনেক মারা যায়। তাই আমি যেতে বারং করি। পরে লিভিয়ার দালালরা আমার ছেলেকে ভয় দেখায়। তাকে লিভিয়ায় ছেড়ে দিবে এতে করে তার জীবন চলে যাবে। সেই ভয়ে সে ট্রলারে যাওয়ার জন্য রাজি হন। গত ২৩ জানুয়ারি রাতে ট্রলারে উঠেন আমাদের বাপ্পী। তার সাথে শেষ কথা ছিল ওটি। আর কোন কথা বলতে পারি নি। দুই দিন পর লিভিয়ার দালাল পারভেজ জানান বাপ্পী ইটালী রিসিভ হয়েছে ওএখন অসুস্থ ওর জন্য দোয়া করতে বলে। আমরা এখানে দোয়া করি। তারপর দিন বাপ্পীর সাথে থাকা এক সিলেটের ছেলে আমাকে ফোন দিয়ে বলে যে বাপ্পী মারা গেছে। আমি সাথে সাথে পারভেজকে ফোনা দেই। কিন্তু সে আর ফোন ধরে না। সরকারি ভাবে সহযোগিতার কারণে অতিদ্রুত লাশ টি দেশে আনতে পেরেছি।

নিহতের মা লাভলী বাসার বলেন, আমার বাপ্পী একা ই। ওরা দুই বোন। বাপ্পীর বাবা পাশ্ববর্তী দালাল নাসির উদ্দিন বেপারীর সাথে কয়েকবার ঝগড়া করেন যাতে করে বাপ্পীকে না বলে বিদেশের কথা। বাড়িতে আসলেও একদিন সবাই মিলে তাড়িয়ে দেই। কিন্তু আমার ছেলে দোকানদারী করে। সেখানে ওরে ভুলিয়ে ভালিয়ে ভালো ভাবে ইটালী পৌছাবে এমন কথা বলে পাঠায়। এখন আমার সব শেষ। ছেলেও নাই কিছু ই নাই। ছেলের ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন ছিল বাড়িতে একটি ঘর করবে বাবাকে আর দোকান করতে দেবেনা। নিজের ছেলে কামাই করবে বাবায় নিজের মতো করে দেশে খরচ করবে। সব সময় স্বপ্ন দেখত যাতে করে কখনো কষ্ট না পেতে হয় তার বাবা-মাকে। কিন্তু আজকে ছেলেটিও চলে গেল আমার। আর কি আছে আমার। কিছু নাই। যে স্বপ্ন ছিল বাবা বিদেশ থেকে এসে মা বলে ডেকে আমাকে জড়িয়ে ধরবে। সে আজ আসলো! কফিনবন্দি! এই কফিনে আমার ছেলের লাশ।

নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অবনি শংকর কর বলেন, দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নড়িয়ার এক তরুণ অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাচ্ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। দালাল চক্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

মন্তব্য

comments

শরীয়তপুর নিউজে প্রকাশিত কোন তথ্য, ছবি, রেখচিত্র, আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যাবহার করা নিষেধ!!