শরীয়তপুর জেলার পরিচিতি

ইতিহাস
পলাশীর যুদ্ধে লর্ড ক্লাইভ সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করার পর ১৭৬৫ সালে এ জেলা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সৃষ্ট প্রশাসনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। শরীয়তপুর সহ ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ঢাকা নিয়াবত গঠন করা হয়। ঢাকা নিয়াবত একজন নায়েব সুবাদার বা নাইব নাজিম ঢাকাকে কেন্দ্রস্থল হিসেবে গঠন করে শাসন পরিচালনা করেন।

শরীয়তপুর জেলা পূর্বে বৃহত্তর বিক্রমপুর এর অংশ ছিল। ১৮৬৯ সালে প্রশাসনের সুবিধার্থে ইহাকে বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ করা হয়। কিন্তু এ অঞ্চলের জনগণের আন্দোলনের মুখে ১৮৭৩ সালেই এ অঞ্চলকে মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্গত করে ফরিদপুর জেলার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

ভাইসরয় লর্ড কার্জনের সময় ১৯০৫ সালে বাংলাকে দু‘টো ভাগে বিভক্ত করা হয়। এ বিভক্ত বাংলার ইতিহাসে সুদুর প্রসারী ফল বিস্তার লাভ করে।

এর পর ক্রমে ক্রমে শরীয়তপুরের অঞ্চল সহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সুত্রপাত হয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় রাজনৈতিক দলের কর্মীরাই এ জেলায় সক্রিয় ছিলেন। এমনকি ১৯১০ হতে ১৯৩৫ সালের দিকে এ অঞ্চলের বহু বিপ্লবী সক্রিয়ভাবে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য অংশ নেন। লোনসিংএ জন্মগ্রহণকারী বিপ্লবী পুলিনবিহারী দাস এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

১৯৪৭ সালর ১৪ ই আগষ্ট হতে ১৯৭১ সালের ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত শরীয়তপুর জেলা সহ এ প্রদেশ ছিল পাকিস্তানেরই একটি অংশ।

প্রশাসনিক সুবিধার্থে মাদারীপুরের বৃহৎ পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক মহকুমা গঠনের প্রয়াস ১৯১২ সাল হতেই নেয়া হয়েছিল। এর পরে পাকিস্তান সৃষ্টিও বাংলাদেশের অভ্যুদয় নতুন প্রশাসনিক দৃষ্টি ভঙ্গি গঠন করতে সহায়তা করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় মাদারীপুরের পূর্বঞ্চল নিয়ে একটি নতুন মহকুমা গঠিত হবে। বিষয় নির্বাচনী কমিটির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, বৃটিশ বিরোধী তথা ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর নামানুসারে এর নাম করণ হয় শরীয়তপুর এবং এর সদর দপ্তরের জন্য পালং থানা অঞ্চলকে বেছে নেয়া হয়। ১৯৭৭ সালের ১০ ই আগষ্ট রেডিওতে সরকার কর্তৃক মহকুমা গঠনের ঘোষণা দেয়া হয় এবং ঐ বছরের ৩রা নভেম্বর এ মহকুমার আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপদেষ্টা জনাব আবদুল মোমেন খান। প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন জনাব আমিনুর রহমান। এর পর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোঃ এরশাদ সরকারের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে শরীয়তপুর মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করা হয়। ৭ই মার্চ ১৯৮৩ সালে জেলা গঠনের ঘোষণা হয়। ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ শরীয়তপুর জেলার শুভ উদ্বোধন করেন তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী জনাব নাজিম উদ্দিন হাশিম। বর্তমান শরীয়তপুর বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা।

ভূগোল ও জলবায়ু
শরিয়তপুর জেলার আয়তন ১১৮১.৫৩ বর্গকিলোমিটার। এই জেলার উত্তরে মুন্সীগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে বরিশাল জেলা, পুর্বে চাঁদপুর জেলা এবং পশ্চিমে মাদারিপুর জেলা। গড় তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। গড় বৃষ্টিপাত ২১০৫ মি মি। এটি মূলত চর এলাকা।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ
শরিয়তপুর জেলা ৬ টি উপজেলা, ৭ টি থানা, ৫টি মিউনিসিপ্যালিটি, ৬৪টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৫টি ওয়ার্ড, ৯৩টি মহল্লা, ১২৩০টি গ্রাম এবং ৬০৭টি মৌজা নিয়ে গঠিত।

এই জেলার উপজেলাগুলো হলঃ

জাজিরা উপজেলা
শরীয়তপুর সদর উপজেলা
গোসাইরহাট উপজেলা
ডামুড্যা উপজেলা
ভেদরগঞ্জ উপজেলা
নড়িয়া উপজেলা।
এগুলোর বাইরে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুরকে থানার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

উপজেলার নাম আয়তন
১ সদর ১৭৫·০৮
২ জাজিরা ২৩৯·৬০
৩ নড়িয়া ২২১৮·৭০
৪ ভেদরগঞ্জ ৮৫·২০
৫ ডামুড্যা ৯১·০০
৬ গোসাইরহাট ১৩৩·১০
৭ সখিপুর ১৫৩·৩০

বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব

১. অতুলপ্রসাদ সেন, আইন ব্যবসা ও গানের গীতিকার
২. আবু ইসহাক, ঔপন্যাসিক
৩. সর্দার নগেন্দ্রশেখর চক্রবর্তী ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী।
৪. বারোভূঁইয়ার বিপ্লবী চাঁদ রায় ও কেদার রায়, দক্ষিণ বিক্রমপুরের আড়া ফুলবাড়িয়ায়(বর্তমান নদীতে বিলীন নড়িয়া উপজেলার অংশ) জন্মগ্রহণ করেন।
৫. রাজবল্লভ সেন – বিক্রমপুর রাজা
৬. পুলিন বিহারী দাশ (১৮৭৭-১৯৪৯) ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিখ্যাত বিপ্লবী এবং ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা।
৭. গোলাম মওলা- চিকিৎসক ও ভাষা সৈনিক
৮. আবিদুর রেজা খান, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন, প্রাক্তন সাংসদ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের প্রথম গভর্নর; আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাণ্ডারি।
৯. আব্দুর রাজ্জাক (রাজনীতিবিদ), প্রাক্তন পানি সম্পদ মন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মহান মুক্তিযোদ্ধা।
১০. আবদুল মোতালেব সরদার – প্রাক্তন ফুটবল খেলোয়াড় কলকাতা মোহামেডান ।
১১. কর্নেল (অব:) শওকত আলী – মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংসদ সদস্য এবং ডেপুটি স্পীকার
১২. এ কে এম এনামুল হক শামীম – উপমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ

অর্থনীতি
এই জেলায় বসবাসকারী মানুষের বেশীর ভাগ কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। উৎপাদনশীল শস্যের মধ্যে রয়েছে ধান, পাট, গম, পিঁয়াজ, মিষ্টি আলু, টমেটো প্রভৃতি। এর মধ্যে পাট, পিঁয়াজ, আদা, টমেটো প্রধান রপ্তানী পণ্য হিসেবে বিবেচিত।

শিল্প ও বাণিজ্য
এই জেলায় শিল্প কারখানা তেমন গড়ে উঠেনি। বর্তমানে এ জেলায় নিম্নোক্ত শিল্পগুলো আছে। চাউলের কল : ১৬৪ টি।আটার কল : ১১২ টি।ময়দার কল : ৪ টি।বরফের কল : ১৩ টি। তেলের কল : ৩ টি।

পত্র-পত্রিকা
দৈনিক রুদ্রবার্তা
দৈনিক হুংকার
শরীয়তপুর নিউজ ২৪.কম
দৈনিক বর্তমান এশিয়া
দৈনিক যুগন্ধর
সাপ্তাহিক বার্তাবাজার
সাপ্তাহিক কাগজের পাতা
সাপ্তাহিক শরীয়তপুর সংবাদ
নড়িয়া বার্তা
শরীয়তপুর প্রতিদিন

যোগাযোগ ব্যবস্থা
বাস ও নদী পথ উভয়ই আছে। ঢাকা যেতে প্রথমে বাস করে মাওয়া তারপর লঞ্চে করে নদী পাড় হয়ে মাঝিরঘাট সেখান থেকে বাসে করে যেতে হয়।

খেলাধূলা ও বিনোদন
কানামাছি, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, হাডুডু, ক্রিকেট, ফুটবল

ভাষা ও সংস্কৃতি
বাংলা ভাষাই প্রধান ভাষা। এ এলাকার মানুষের সংষ্কৃত বাঙ্গালীদের অনুরূপ।

চিত্তাকর্ষক স্থান
১. কোদালপুর দরবার শরীফ – কোদালপুর।
২. সুরেশ্বর দরবার শরীফ – নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর;
৩. মডার্ন ফ্যান্টাসি কিংডম-নড়িয়ার কেদারপুর ইউনিয়নের কলুকাঠি নামক গ্রামে এটি আবস্তিত।এখানে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাছের একুরিয়াম ।তাছারা এখানে চিড়িয়াখানা সহ শিশুদের বিনোদনের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।শরীয়তপুর জেলার একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত।
৪. বুড়ির হাট মসজিদ – ডামুড্যা উপজেলার বুড়ির হাট;
৫. রুদ্রকর মঠ – সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়ন;
৬. শিবলিঙ্গ – নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়ন;
৭. মহিষারের দীঘি – দক্ষিণ বিক্রমপুর;
৮. হাটুরিয়া জমিদার বাড়ি – গোসাইরহাট উপজেলা;
৯. রাম সাধুর আশ্রম – নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়ন;
১০. মানসিংহের বাড়ী – নড়িয়া উপজেলায় ফতেজংগপুর;
১১. ধানুকার মনসা বাড়ি।